বিশেষ প্রতিনিধি: সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের এক সংক্ষিপ্ত ঝটিকা মিছিলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে ব্যাপক কৌতুহলের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে সাময়িক আলোচনার জন্ম দিলেও, আবেগভিত্তিক বিশ্লেষণের বাইরে গিয়ে বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কর্মকর্তাদের অতীত ভূমিকার নিরপেক্ষ পর্যালোচনা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন অভিজ্ঞ অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদরা। আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের যেকোনো পরিস্থিতিতে কোনো একক কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে হঠাৎ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। বিশেষ করে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাউদ হোসেনের মতো অভিজ্ঞ ও চৌকস পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত ক্যারিয়ার মূল্যায়ন করলে দেখা যায়, তাঁর কর্মজীবনের মূল ভিত্তিই ছিল শতভাগ পেশাদারিত্বসহ সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, সাহসিকতা এবং নিরপেক্ষতা।
খিলগাঁও পর্ব: অদম্য সাহস ও ন্যায়ের দৃষ্টান্ত:
অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, গুলশান থানায় যোগদানের পূর্বে খিলগাঁও থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দাউদ হোসেন যে অকুতোভয় আইনি ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য নজির। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং প্রভাবশালী নেতাকর্মীদের দমনে তিনি সম্পূর্ণ আইনি ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় আমলে না নিয়ে তাঁদের আইনের আওতায় আনার কারণে ওসি দাউদ হোসেনকে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের তীব্র রোষানলে পড়তে হয়েছিল। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলটির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন মাধ্যম থেকে তাঁর নাম উল্লেখ করে একাধিকবার হুমকি প্রদান করা হয়। সমস্ত ঝুঁকি এবং ভয়ভীতি উপেক্ষা করে জীবনের ও ক্যারিয়ারের তোয়াক্কা না করে নিজ দায়িত্বে অটল থাকা ও সততার সাথে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া একজন সৎ ও স্বাধীনচেতা পুলিশ কর্মকর্তার পরিচয় বহন করে।
ঝটিকা মিছিলের বাস্তবতা ও প্রশাসনিক পরিপক্কতা:
রাজধানীর একটি স্পর্শকাতর এবং গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হলো গুলশান। যেকোনো হঠাৎ সংঘটিত ঘটনা বা ঝটিকা মিছিল প্রতিহত করার ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের একক কোনো কর্মকর্তার অবহেলা হিসেবে দেখা যৌক্তিক নয়। বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে যিনি চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও কোনো গোষ্ঠীর কাছে নতি স্বীকার করেননি, একটি আকস্মিক ঘটনার ওপর ভিত্তি করে তাঁর পেশাদারিত্ব বা যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার পরিপন্থী। বরং রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে ক্ষমতার রাজনৈতিক সমীকরণ যাই হোক না কেন, নিজের সুনির্দিষ্ট আইনি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যে ক’জন পুলিশ কর্মকর্তা সর্বদা প্রস্তুত ও অটল থাকেন, দাউদ হোসেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তাঁর মতো একজন সৎ ও নিষ্ঠাবান পুলিশ সদস্যের পূর্ববর্তী ভূমিকা মূল্যায়ন না করে অযাচিতভাবে কোনো অভিযোগ আনা একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার মনোবল ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
রাজনৈতিক মাঠের দায়িত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য:
রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করেন, মাঠপর্যায়ের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সামাল দেওয়া বা একটি নিষিদ্ধ দলের রাজনৈতিক তৎপরতা মোকাবিলা করা কেবল পুলিশ-প্রশাসনের দায়িত্বের অংশ নয়। মাঠের রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে সচেতন রাখা ও শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা স্থানীয় রাজনীতি এবং গণমানুষের সহযোগিতার ওপরও অনেকাংশেই নির্ভরশীল। কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে সচেতন সামাজিক পরিবেশ বজায় রাখা একটি সমন্বিত প্রক্রিয়ার অংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের কাছ থেকে দায়িত্বশীলতা আশা করা যেমন স্বাভাবিক, তেমনই সৎ ও পেশাদার রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কর্মকর্তাদের সততা এবং ত্যাগের যথাযথ সম্মান দেওয়া রাষ্ট্রের প্রতিটি দায়িত্বশীল নাগরিকের কর্তব্য। ওসি দাউদ হোসেনের মতো একজন দক্ষ, সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের ঢালাও অভিযোগে অভিযুক্ত না করে তাঁদের পেশাগত সম্মান বজায় রাখা প্রয়োজন, যেন পুলিশ বাহিনীর নীতিবান অফিসাররা নিজেদের দায়িত্ব আরও শক্ত হাতে এবং নির্ভয়ে পালন করতে পারেন। তাহলেই আইন, বিচার ও প্রশাসনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে বাস্তবমুখী ও গঠনমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমেই সমাজ ও রাষ্ট্রে সঠিক বিচার, সুশাসন ও শান্তির পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
Leave a Reply