ঈদ মানেই আনন্দ, ঈদ মানেই নতুন পোশাক, ঈদ মানেই প্রিয় সান্নিধ্যে ঘরে ফেরা। প্রতি বছর বাংলাদেশের মানুষরা ঈদের সময় মাটির টানে তার উৎসে ফেরে, মানুষ ফিরে আসে মূলে। উদ্দেশ্য আত্মীয়-পরিজন নিয়ে ঈদের আনন্দ উপভোগ করা। পরিবারের সঙ্গে ঈদ আনন্দ উপভোগ করা এ দেশের মানুষের চিরন্তন আকাক্সক্ষা।
পরিবার-পরিজন ছাড়াও গ্রামের সঙ্গে, গ্রামের মানুষের সঙ্গে, এখনও এ দেশের মানুষের আত্মার সম্পর্ক অটুট। এই বন্ধন আমাদের সামাজিক সংহতিকেও অনেক নিবিড় ও সুদৃঢ় করেছে।
তার উপরে আছে পরিবার-পরিজন। এ দেশের অধিকাংশ পরিবারের কেউ না কেউ এখনো গ্রামে অবস্থান করে। অধিকাংশ মানুষের জন্মনাড়ি পোঁতা আছে গ্রামের মাটিতে। সে নাড়ি প্রতিনিয়ত রাখালিয়া বাঁশি শোনে, শোনে নদীর কলকল ধ্বনি, শোনে দূরে অবস্থান করা সন্তানটির জন্য মায়ের আহাজারি। দেখে সকাল-সন্ধ্যা সন্তানের মঙ্গল কামনায় আকাশ পানে তোলা মায়ের দুটি হাত, দেখে সন্তানের প্রিয় খাবারগুলো মা আর মুখেও তোলে না। তাই সে নাড়ি মানুষকে মূলে ফেরার আহ্বান জানায়। বার বার স্মরণ করিয়ে দেয় তার ফেলে আসা দিনগুলোর কথা, অপেক্ষমাণ মানুষগুলোর কথা। বাড়ি ফেরার পথে হাটের পাশে অগণন বয়সের বটবৃক্ষের কথা, এর সঙ্গে মনে করিয়ে দেয় ছেলেবেলার বন্ধুদের অকৃত্রিম ভালোবাসার কথা। বন্ধুরা পথ চেয়ে আছে, কখন ফিরবে শহরে কর্মরত বন্ধুটি। ফিরলেই ভরিয়ে দেবে ভালোবাসায়, আনন্দে আর গল্পকথায়। কত কথা জমা হয়ে আছে বুকের অলিন্দে।
আনন্দের দিনগুলো তাদের সঙ্গে কাটানোর এক তীব্র আকাক্সক্ষা মানুষকে ঘরমুখো করে। তাইতো পথের সব বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে মানুষ বাড়ি ফেরে। তিল তিল করে অর্থ জমায়, আর প্রিয়জনের জন্য কিনে আনে সাধ্যমত উপহার। উপহার পাওয়া প্রিয় মুখের হাসি এবং প্রিয়জনের সান্নিধ্যে মুহূর্তেই ভুলিয়ে দেয় সব কষ্ট। একটি আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয় গ্রামের বাড়িতে। নির্ধারিত ছুটির মধ্যে আত্মীয়-স্বজনের সাক্ষাৎ যেন স্বর্গীয় অনুভূতি এনে দেয়। কর্মব্যস্ত মানুষগুলো হয়ে ওঠে হাস্যোজ্জ্বল, শিশুর মতো চঞ্চল। আনন্দ যেন আনন্দধারা হয়ে ধরা দেয় মানুষের মাঝে।
ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে উচ্ছ্বাস। ঈদের আনন্দ বহুগুণে বৃদ্ধি পায় যখন পরম আত্মীয়ের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়া যায়।
কোনো কোনো পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটি শহরে কাজ করে, তার সন্তান অপেক্ষা করে বাবা আসবে, সঙ্গে থাকবে খেলনা, নতুন জামা। সন্তানটি নিজেও জানে না, বাবার কাছ থেকে তার নতুন জামার কাক্সক্ষার পেছনে থাকে বাবার উষ্ণ বুকে মাথার রাখার প্রবল ইচ্ছে। বাবারও দীর্ঘ সময়ের প্রতীক্ষা থাকে সন্তানকে বুকে জড়ানোর তীব্র তৃষ্ণা। থাকে প্রেয়সীর কোমল বুকে মুখ গুঁজে পথের ক্লান্তি দূর করার অদম্য ইচ্ছা।
গ্রামে থাকা বাবা-মাও অপেক্ষা করে সন্তান আসবে। কড়া নেড়ে বলবে, ‘আমি এসেছি’। একরাশ আনন্দের শীতল বায়ু নিয়ে সন্তান আসবে।
পলিমাটি বিধৌত বাংলাদেশের মানুষের মন পলির মতো কোমল। এখানে শুধুই জন্মে নিবিড় ভালোবাসা। এদেশের মানুষ প্রাণভরে ভালোবাসতে জানে। তাই পাশের বাড়ির প্রতিবেশীটির সঙ্গেও গড়ে ওঠে প্রাণের সম্পর্ক। এভাবেই নাড়ির টান প্রতিনিয়তই শাণিত হয় কোমল মনে। আর তাতে জল সিঞ্চন করে এ দেশের ঋতুবৈচিত্র্য।
তাই পবিত্র সংযমের মাস এলেই বাংলাদেশের মানুষের মনের মধ্যে যে গানটা তার মনের কথা হয়ে গুন গুন করে বাজে তা হলো, ‘ফিরে চল, ফিরে চল, মাটির টানে / যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে,’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাটিছোঁয়া মানুষের প্রাণের কথাটা বুঝতে পেরেছিলেন, তাই বুঝি নিজের প্রাণে সুর তুলেছেন সবার কথা বলে।
এ দেশের মানুষ জানে ‘মানুষ মানুষের জন্য’। জানে ভালোবাসা দিলে ভালোবাসা মেলে। আনন্দ ভাগ করে নিলে তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, কষ্ট ভাগ করলে তা অর্ধেক হয়ে যায়। তাই সুযোগ পেলেই আনন্দ বিতরণ করে। এমনও দেখা যায় বাড়ি ফেরার তাগিদে মানুষ যাত্রার কষ্ট ভাগ করে নেয়, আনন্দ ছড়িয়ে দেয়।
দেখতে দেখতে আমরা রোজার প্রায় শেষের দিকে চলে এসেছি। চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ১০ কিংবা ১১ তারিখ ঈদ হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই সময় সবারই মন পড়ে আছে প্রিয়জনের কাছে। মানুষ ছুটছে যার যার গন্তব্যে। যদিও এখনো সরকারি বা বেসরকারি অফিস ছুটি ঘোষণা করা হয়নি। তবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তাই শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যাচ্ছে। মূল কারণ হলো রাস্তার ভিড় এড়ানো, কোনো কোনো পরিবারের প্রধান ব্যক্তিটি সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে নিজে আরও পরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কেউ কেউ ঈদের চাঁদ দেখা গেলে হয়তো ‘ও মন রমজানেরই রোজার শেষে এলো খুশি ঈদ’, কাজী নজরুল ইসলামের সেই গানটির মন মিলিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেবে।
সব দিক বিবেচনায় এবারের ঈদযাত্রা অনেক আনন্দের, বাংলাদেশের উন্নয়নের মূল চিত্র, সক্ষমতা ও গৌরবের প্রতীক পদ্মা সেতু দূর করেছে দূরত্ব আপন এবং পরকেও করেছে বন্ধু। ওপাড় এবং এপাড়ের মানুষের মধ্যে হৃদ্যতা আরও বেড়ে গেছে। অতি অল্প সময়ের মধ্যে ওপাড়ে যাওয়া যায় বলেই মানুষ পদ্মা সেতু পাড়ি দিয়ে বেড়াতে যেতেও ভালোবাসে। চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান টানেল, এটি বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ায় নদীর নিচে প্রথম টানেল নির্মিত হয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখা হাসিনার সাহসী ও স্বপ্নদর্শী নেতৃত্বের এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে। এটি বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত ও সহজতর করেছে।
দেশের সব প্রান্তে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থাও হয়েছে আগের চেয়ে আরও অনেক বেশি উন্নত। তাছাড়া নতুন নতুন সড়ক ও সেতু নির্মাণের ফলে বদলে যাচ্ছে দেশের আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। ফলে আগের চেয়ে সহজেই মানুষ ঈদের জন্য বাড়িমুখী যাত্রা করতে পারছে।
ঢাকা এখন ফ্লাইওভারের শহর, এটি মানুষকে অনেক দুর্ভোগ থেকে রক্ষা করেছে। অনেক সুবিধার মতো এবারের ঈদযাত্রা যানজটমুক্ত, দুর্ভোগহীন এবং নিরাপদ হয়েছে। খুব সহজেই মানুষ তাদের গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে। এ দেশে ঈদের আনন্দ শুধু ঈদে নয়, ঈদের অনেক আগে থেকে উপভোগ করে। আনন্দ অনাবিল উজ্জ্বল হয় যখন ঈদের প্রস্তুতি শুরু হয়।
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সড়ক, রেল ও নৌপথে প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। কিন্তু ভোগান্তি কি দূর হবে? নাকি প্রতিবছরের মতো একই চিত্র লক্ষ করা যাবে? ঈদে ঘরে ফেরা মানুষের দুর্ভোগ কমাতে যানজটপ্রবণ চিহ্নিত স্পটগুলোর প্রতি প্রশাসনকে বিশেষ ভাবে নজর রাখতে হবে। তাহলে দুর্ভোগমুক্ত নিরাপদ হবে ঈদযাত্রা।
রুনা বেগমঃ সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতি
Leave a Reply