দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ। ব্যবসাবাণিজ্যের এই প্রধান কেন্দ্রে একসময় দিনরাত একাকার হয়ে যেত ট্রাকের হর্ন, কুলি-মজুরের হাঁকডাক আর ডিও হাতবদলের কোটি টাকার খেলায়। কিন্তু আজ সেই চেনা কোলাহলে কিছুটা ভাটার টান।
ইউক্রেনের গমের মাঠ কিংবা লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজে পড়া বোমার আওয়াজ হাজার মাইলদূরের এই খাতুনগঞ্জের সরু গলিতেও প্রবল ভূকম্পন তৈরি করেছে।রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের দর ওঠানামা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির চাপে পিষ্ট খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা। তবে নানান বাধায় খাদের কিনারা থেকে খড়কুটো আঁকড়ে ধরে কৌশল বদল করে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন এখানকার লড়াকু ব্যবসায়ীরা।দেশের ভোগ্যপণ্যের বৃহৎ বাজার খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সহসম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ বলেন, খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের বাঁচাতে হলে এখন সরকারের কার্যকর ‘পলিসি সাপোর্ট’ প্রণয়ন করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের এলসি খোলার ক্ষেত্রে ডলারের একটি স্থিতিশীল রেট নিশ্চিত করার পাশাপাশি এলসি মার্জিন সহজ, বার্ষিক চাহিদার বিপরীতে পণ্য আমদানি অনুমতি (আইপি) দেওয়াসহ আমদানি সহজ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।খাতুনগঞ্জ আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, একের পর এক ধাক্কার কারণে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের অবস্থা খুবই নাজুক। ব্যবসায়ীরা এখন টিকে থাকার সংগ্রাম করছেন। ব্যবসায়ীরা ‘রক্ষণশীল পদ্ধতি’ অবলম্বন করে ডিও এবং বাকিতে বিক্রি কমিয়ে দিয়েছেন। লোকসান এড়াতে অতিক্তি মজুত থেকে বের হয়ে প্রয়োজনভিত্তিক পণ্য আমদানি করছেন।চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, দেশের বৃহৎ এ বাজারের আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা বর্তমানে নানামুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে প্রথম ধাক্কাটি এসেছে। এ যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে গম, ভোজ্য তেল (সরিষা ও সূর্যমুখী), ডাল এবং মসলাজাতীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদরে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়। বিকল্প বাজার থেকে পণ্য আনতে গিয়েআমদানিকারকদের গুনতে হয়েছে বাড়তি অর্থ।
সেই ধাক্কা পুরোপুরি সামলে ওঠার আগেই নতুন করে শুরু হয় মধ্যপ্রাচ্যের সংকট।সঙ্গে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার কারণে আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো বাধ্য হয়ে তাদের রুট পরিবর্তন করছে। এতে পণ্য পৌঁছানোর সময় ১৫ থেকে ২৫দিন বেড়ে গেছে। সঙ্গে জাহাজ ভাড়া এবং ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম বেড়েছে কয়েক গুণ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই বাড়তি খরচের পুরো দায়ভার এসে পড়ছে খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীদের কাঁধে, যা শেষ পর্যন্ত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার বিপরীতে ডলারের দামের ওঠানামা। একই সঙ্গে কিছু কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ১০০ শতাংশ মার্জিন দিয়ে এলসি করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এতে ব্যবসায়ীদের পুঁজি বা ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল আটকে যাচ্ছে। বাড়তি মূলধনের জোগান দিতে গিয়ে ব্যাংক ঋণের সুদের চাপ বাড়ছে। ফলে ছোট ও মাঝারি আমদানিকারকরা অনেকেই বাজার থেকে ছিটকে পড়ছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক ও দেশে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি। তবে এত সবপ্রতিকূলতা ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার পরও খাতুনগঞ্জ-চাক্তাইয়ের ব্যবসায়ীরা হাল ছাড়তে রাজি নন।
এখানকার ব্যবসায়ীরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিজস্ব কিছু কৌশল অবলম্বন করে টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। ঝুঁকি কমাতে তারা এখন আগের মতো বাকিতে পণ্য বিক্রি অনেকাংশেই কমিয়ে এনেছেন। লোকসান এড়াতে অতিরিক্ত মজুত করার প্রবণতা থেকে সরে এসে ‘প্রয়োজনভিত্তিক’ পণ্য আমদানির দিকে ঝুঁকছেন। এ ছাড়া আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে অনেকেই দেশীয় উৎপাদিত কৃষিপণ্য ও কনজ্যুমার গুডসের দিকে ব্যবসা সম্প্রসারণ করছেন।
Leave a Reply