শালবনের কুয়াশায় লেখা এক পান্ডুলিপি
মুক্তাগাছার ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি যেখানে শব্দেরা আগুন হয়ে ওঠে
মো: রাসেল ফকির :
প্রকৃতি যখন প্রথম কবিতা, মধ্য পৌষের সকাল। কুয়াশা তখনো শালবনের গায়ে লেগে আছে শিশিরের মতো। পাতার ডগায় জমে থাকা জলবিন্দু রোদের খোঁজে কাঁপছে। দূরে উড়তে থাকা অতিথি পাখিরা দল বেঁধে ডাকছে কিচিরমিচিরে যেন তারা সময়ের কাছে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। কোথাও জলধারার শব্দ, কোথাও শেয়ালের অদৃশ্য ডাকে ভেসে আসে প্রাচীন কোনো বনের স্মৃতি।
এই প্রকৃতিই যেন সেদিন হয়ে উঠেছিল প্রথম কবিতা, প্রথম গান, প্রথম পাণ্ডুলিপি। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায়, মধুপুর শালবনের ভেতর ছালোড়া নামের নির্জন এক প্রান্তে, প্রকৃতির এই গভীর নীরবতার ভেতর দিয়েই জন্ম নেয় সাহিত্য আড্ডা ‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’।
সময়ের হিম, শব্দের উষ্ণতায় সুন্দরের ছোঁয়া,
আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে যন্ত্র আমাদের জীবনের প্রতিটি কোণে ঢুকে পড়েছে। অনুভূতিগুলো অনেক সময় জমে যায় বরফের মতো স্পর্শ পায় না, আলো পায় না। এই হিম সময়েই সাহিত্যের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। কারণ সাহিত্যই পারে মানুষের ভেতরের জমাটবাঁধা স্তর গলিয়ে দিতে।
মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদের আয়োজনে এই আড্ডা ছিল সেই গলিয়ে দেওয়ারই একটি প্রয়াস। আড্ডার নাম‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’নিজেই যেন একটি রূপক। হিমে ছোঁয়া সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে শব্দের উষ্ণতা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা।
শালবনের বুকে একটি দিন,
দিনব্যাপী এই আয়োজনে অংশ নেন কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, বাচিক শিল্পী, সাংবাদিক, শিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মীরা। শহরের কোলাহল ছেড়ে তারা এসে বসেন বনের ভেতর, মাটির কাছাকাছি, প্রকৃতির সান্নিধ্যে। এখানে কোনো মঞ্চের জাঁকজমক নেই, নেই আলো ঝলমল সাজ আছে কেবল মানুষ আর মানুষের কথা।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মুক্তাগাছা সাহিত্য সংসদের সভাপতি কবি সুরঞ্জিত বাড়ই। তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে সাহিত্যের দায়বদ্ধতা ও স্থানীয় সাহিত্যচর্চার প্রয়োজনীয়তা। সাধারণ সম্পাদক কবি সৌহার্য্য ওসমান-এর সঞ্চালনায় আড্ডা কখনো আনুষ্ঠানিকতা ছাপিয়ে হয়ে ওঠে ঘরোয়া, কখনো আবার গভীর চিন্তার ক্ষেত্র।
কথায় কথায় দর্শন,আড্ডার উদ্বোধক মুক্তাগাছা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মতিউর রহমান খোকন বলেন, সাহিত্য মানুষের ভেতরে নৈতিক শক্তি তৈরি করে। প্রধান অতিথি তারুণ্যের বাংলাদেশ-এর চেয়ারম্যান আলামিন সুজন তাঁর বক্তব্যে বলেন, “রাষ্ট্র বদলাতে রাজনীতি লাগে, সমাজ বদলাতে লাগে আন্দোলন কিন্তু মানুষ বদলাতে পারে একমাত্র সাহিত্য।”
প্রধান আলোচক কবি কাজী নাসির মামুন সময়, নিঃসঙ্গতা ও লেখকের ভূমিকা নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। তাঁর মতে, “এই সময়ের কবিতা হিমে ঢাকা কিন্তু সেই হিমের ভেতরেই আগুন লুকিয়ে থাকে।”
বিশেষ আলোচক হিসেবে কবি মাহবুবুল আলম রতন, বাচিক শিল্পী ও নাট্যকার মিহির হারুন, কবি দীপংকর মারডুক, প্রাবন্ধিক এম ইদ্রিছ আলী, শিক্ষাবিদ হাবিবুর রহমান হিরা, কবি ও সাংবাদিক ফেরদৌস তাজ সাহিত্যের নানামুখী সংকট ও সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন।
৫. কবিতা পাঠ শব্দের ব্যক্তিগত উৎসব
আলোচনা শেষে শুরু হয় কবিতা পাঠ। শালবনের নিস্তব্ধতায় একে একে উচ্চারিত হয় কবিতার পঙ্ক্তি। কবি সফিক সিদ্দিকী, আল আমিন মন্ডল, রোকন শাহরিয়ার সোহাগ, শাহিদ লোটাস, সেলিম সাইফুল, হাসান মাসুদ, মুজিব রাহমান, আব্দুস সালাম, রিপন সারওয়ার, তাজুল ইসলাম, রাশিদুল আলম শিমুল, মীর সবুর, তারিকুল ইসলাম ছোটনসহ অনেকেই পাঠ করেন তাঁদের লেখা কবিতা।
কবিতাগুলো কখনো প্রেমের, কখনো প্রতিবাদের, কখনো নিঃসঙ্গ মানুষের আত্মকথন। শব্দগুলো বাতাসে মিশে যায়, আবার ফিরে আসে শ্রোতার ভেতরে।
৬. গান, অভিনয় ও লোকজ স্মৃতি
ফোকলোর গবেষক মাসুদ পারভেজ লোকজ সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা নিয়ে কথা বলেন। গান ও একক অভিনয়ে অংশ নেন শিল্পীরা। মিহির হারুনের একক অভিনয়ে জীবনের ক্লান্তি ও স্বপ্ন যেন একসঙ্গে ধরা দেয়। গানগুলো শালবনের নীরবতায় নতুন মাত্রা যোগ করে।
একটি আড্ডা, একটি প্রতিজ্ঞা,
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসে। কুয়াশা আবার নেমে আসে শালবনের গায়ে। কিন্তু আড্ডা শেষ হলেও কথোপকথন শেষ হয় না। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কবি-সাহিত্যিকরা কথা বলেন কবিতা, জীবন, রাজনীতি, ভবিষ্যৎ নিয়ে।
‘হিমছোঁয়া পান্ডুলিপি’ কেবল একটি দিনের আয়োজন নয়। এটি একটি ভাবনা, একটি আন্দোলন যেখানে সাহিত্য প্রকৃতির কাছে ফিরে গিয়ে মানুষের কথা বলে।
৮. মহাকালের দিকে ছুড়ে দেওয়া শব্দ
মহাকাল সবকিছু মুছে দেয় না। কিছু শব্দ, কিছু অনুভূতি সে নিজের সঙ্গে নিয়ে যায়। মুক্তাগাছার শালবনে অনুষ্ঠিত এই সাহিত্য আড্ডা সেই মহাকালের দিকেই শব্দ ছুড়ে দিয়েছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে, যন্ত্রের হিম সময় পেরিয়েও মানুষের সৃজনশীলতা টিকে থাকবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে মানুষ করে রাখে সাহিত্যই।
Leave a Reply