রিপন আলী রাজশাহী ব্যুরো,
মৃত ও প্রবাসী ভোটার এবং ভুয়া ঠিকানাধারী ২১৩টি অবৈধ ভোট বাতিলসহ গঠনতন্ত্র পরিপন্থী কার্যক্রমের অভিযোগ এনে চাঁপাইনবাবগঞ্জে অগ্রণী সেচ প্রকল্পের সদ্য সমাপ্ত ত্রি-বার্ষিক নির্বাচনের ফলাফল স্থগিত ও পুনরায় নির্বাচনের দাবিতে জেলা সমবায় অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করেছেন প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন প্রার্থী।
অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গত ২৫ ডিসেম্বর, ২০২২ ইং তারিখে অগ্রণী সেচ প্রকল্পের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ভোটগ্রহণের সময় একটি প্যানেলের সভাপতি পদপ্রার্থী সাইফুল ইসলাম গাজী, সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক, সহ-সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন ও সদস্য প্রার্থী একেএম মেরাজুল ইসলামের পক্ষে ‘গনকা’ ভোটকেন্দ্রে অবৈধভাবে রাসেল নামে একজনকে পাঠানো হয় এবং ভোট প্রদান করার সময় রাসেলকে হাতে নাতে ধরে প্রশাসনের কাছে সোপর্দ করা হয়। এ সময় রাসেল স্বীকার করে উপরোক্ত প্রার্থীদের পক্ষে তিনি অবৈধ ভোট দিতে এসেছেন। একইভাবে ৬টি ব্লকের ১২টি বুথে অনুপস্থিত ভোটারদের হয়ে অবৈধভাবে প্রায় ২১৩টি ভোট প্রদানের অভিযোগ পাওয়া যায়। এ সময় ভোট প্রদান বন্ধ রাখতে বলা হলেও ভোট প্রদান বন্ধ না করে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন করেন নির্বাচন কমিশন। এ অবস্থায় ভোট বাতিলসহ পুনরায় ভোট গ্রহণের দাবিতে জেলা সমবায় অফিসারের কাছে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
এ বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী সভাপতি প্রার্থী ও অভিযোগ দায়েরকারী মাহফুজ হোসেন বলেন, সেচ প্রকল্পের ৬টি ব্লকের ১২টি বুথে মোট ২১৩ জন ভুয়া ঠিকানাধারী, মৃত ও প্রবাসী ভোটারদের ভোট অবৈধভাবে অন্যকে দিয়ে প্রতিপক্ষ প্যানেল ভোট প্রদান করান। যাদের আমরা নির্বাচন পরবর্তীতে শনাক্ত করেছি এবং গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন পরবর্তী একমাসের মধ্যে আবেদন করার নিয়ম থাকায় জেলা সমবায় অফিসারের কাছে বিভিন্ন অনিয়ম ও ভোট জালিয়াতি এবং কারচুপির বিষয়ে অভিযোগ দায়ের করি এবং দাবি জানায় নির্বাচন বাতিল ও পুনরায় ভোটগ্রহণের।
তিনি অভিযোগে আরও জানান, গঠনতন্ত্রের ১৩-চ ধারা অনুযায়ী সকাল ৯টা থেকে ১টা পর্যন্ত বার্ষিক সাধারণ সভা এবং ১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত নির্বাচনের ভোটগ্রহণ করার নির্দেশনা উল্লেখ থাকলেও গঠনতন্ত্র উপেক্ষা করে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ করেন সমিতির নির্বাচন পরিচালনাকারী সভাপতি ও উপজেলা সমবায় অফিসার শফিকুল ইসলাম। এ অনিয়মের কারণে এজিএমের সদস্যরা এজিএমে ব্যস্ত থাকায় ভোটগ্রহণ বুথগুলোতে ভুয়া, মৃত, প্রবাসী ও ভুয়া ঠিকানাধারী ভোটারদের ভোট অন্যরা দেয়ার সুযোগ নেয়।এছাড়াও তিনি অভিযোগ করেন সমিতির সদ্য বিদায়ী সাবেক সভাপতি আবুল কালাম শামসুদ্দিন (শরীফ মিয়া) ও উপজেলা সমবায় অফিসার শফিকুল ইসলামের যোগসাজেশে নির্বাচনের নীল-নকশা বাস্তবায়ন করেছে। তিনি আরও অভিযোগ করে বলেন, শরীফ মিয়া নয় বছর ধরে সমিতির টাকা লুটেপুটে খেয়েছেন ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম করেছেন, কয়েক বছর আগে একটি ওয়েবসাইট তৈরি খরচ ৩ লক্ষ টাকা দেখিয়েছেন যা অযৌক্তিক সেই ওয়েবসাইট হতে ২ লক্ষ আশি হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। ভোট কেন্দ্র গনকা স্কুল হলেও সেই স্কুলের শিক্ষকদের বাদ দিয়ে শরীফ মিয়া হরিপুরের একটি স্কুলের সভাপতি হওয়ায় তার আজ্ঞাবহ স্কুল শিক্ষকদের ভোট গ্রহণের দায়িত্ব দেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে রয়েছে নারী কেলেঙ্কারীর অভিযোগ।
সমিতির বিদায়ী সভাপতি আবুল কালাম শামসুদ্দিন (শরীফ মিয়া) তার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পর্কে বলেন, ওয়েবসাইট তৈরি সেটা কয়েক বছর আগের কথা, কত টাকা খরচ হয়েছিল সেটা এখন আমার মনে নেই, এর আগের নির্বাচনগুলোতেও এই শিক্ষকদের দিয়েই ভোট নেওয়া হয়েছে তখনতো কথা উঠেনি। নারী কেলেঙ্কারি বিষয়ে তিনি কথা এড়িয়ে বলেন, মাহফুজ যে অভিযোগ করেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বরং এই প্রতিবেদককে বলেন মাহফুজের চরিত্র সম্পর্কে আপনি খোঁজখবর নেন সব জানতে পারবেন।
প্রতিদ্বন্দ্বী সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী ও অভিযোগ দায়েরকারী অপর প্রার্থী হাবিবুর রহমান পিন্টু বলেন, গঠনতন্ত্রের ১২-ক ধারায় (সমবায় আইন সংশোধিত ২০১৩ ও বিধিমালা অনুযায়ী) এলজিইডি ও সমবায় অফিসারের উপস্থিতিতে ব্যবস্থাপনা কমিটির দায়িত্ব হস্তান্তরের নিয়ম থাকলেও; সেখানে এই দু’জন কর্মকর্তার অনুপস্থিতিতে ব্যবস্থাপনা কমিটির সাবেক সভাপতি আবুল কালাম শামসুদ্দিন শরীফ নতুন কমিটির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেছেন। গঠনতন্ত্রের ১৩(১) ক-ধারা অনুযায়ী বার্ষিক সাধারণ সভা আহ্বানের ১৫ দিন আগে সদস্যদের নোটিশ দেয়ার নিয়ম থাকলেও তা দেয়া হয়নি।
নির্বাচনের পূর্বেই নির্বাচনকালীন সভাপতি ও উপজেলা সমবায় অফিসার শফিকুল ইসলামের সঙ্গে সাইফুল ইসলাম গাজী ও এনামুল হক প্যানেলের সখ্যতা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে তার ভূমিকা সন্দেহজনক হওয়ায় সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে, প্রতিদ্বন্দ্বী সভাপতি পদপ্রার্থী মাহফুজ হোসেন ও হাবিবুর রহমান পিন্টু উপজেলা সমবায় অফিসারের অপসারণ ও ভোটার তালিকা হালনাগাদ চেয়ে জেলা সমবায় অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও তাকে দিয়েই নির্বাচন পরিচালনা করা হয়।
আরও অভিযোগ পাওয়া গেছে, ভোটার নং ৫৪৬ (সাদিকুল ইসলাম), ভোটার নং ৪৫৫ (আব্দুল গণি) ও ভোটার নং ২৬০৭ (রোজিনা খাতুন)। তারা ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট প্রদান করতে পারেনি বলে লিখিত অভিযোগ করেন জেলা সমবায় অফিসারের কাছে। তারা অভিযোগ করেন, চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাদের নাম থাকলেও ভোট কেন্দ্রের ভেতরের তালিকায় তাদের নাম না থাকায় তারা ভোট দিতে পারেননি।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভোটের দিন ব্যালট পেপারে পোলিং ও প্রিজাইডিং অফিসারের সাক্ষর ও গোপন সীল ছিল না। এমনকি ভোটের দিন ভোট গণনা শেষে প্রার্থীদের এজেন্টদের রেজাল্ট শিটে কোনো সাক্ষর নেয়া হয়নি এবং রেজাল্ট শিটেও দেয়া হয়নি। এমনকি সমিতির অফিসের নোটিশ বোর্ডে ফলাফল শিট টাঙানো হয়নি। উপজেলা ও জেলা সমবায় অফিসারের কাছে রেজাল্ট শিটের কপি চাওয়া হলেও তারা দিতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন প্রতিদ্বন্দ্বী সভাপতি পদপ্রার্থী মাহফুজ হোসেন ও একাধিক সদস্য ভোটার।
এ অবস্থায় নির্বাচনের সব ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত ব্যালট পেপার, ব্যালটের মুড়ি, ভোটার তালিকায় পোলিং অফিসারদের সাক্ষর ও লাল কালি দিয়ে টিপ মারা কপি সংরক্ষণ ও ব্যালট বক্সসহ নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব প্রকার কাগজপত্র সরকারি হেফাজতে রক্ষণাবেক্ষণে জেলা সমবায় অফিসারের কাছে লিখিত আবেদন দেয়া হলেও এখন পর্যন্ত তা রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। যা নতুন ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছেই সংরক্ষিত থাকায় উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা।
সেচ প্রকল্পের একাধিক সদস্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পদপ্রার্থীরা অভিযোগ করেন, সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটির অনিয়ম ও দুর্নীতি ঢাকতেই নির্বাচন পরিচালনা কমিটি, উপজেলা ও জেলা সমবায় অফিসার এসব অভিযোগ আমলে না নিয়েই ভোট পরিচালনা করেন।
এদিকে নির্বাচনে অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগে অভিযুক্ত প্যানেলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম গাজী ও সাধারণ সম্পাদক এনামুল হক জানান, অনেকে ভোটে ফেল করে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনছেন। আমরা নির্বাচন পরবর্তীতে দায়িত্ব গ্রহণ শেষে ব্যাংক সাক্ষর পরিবর্তন ও সদস্যদের মধ্যে ঋণ প্রদানও অব্যাহত রেখেছি।
তবে দায়িত্ব হস্তান্তরে উপস্থিত না থাকার কারণ সম্পর্কে উপজেলা সমবায় অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান, দায়িত্ব হস্তান্তরে উপস্থিত থাকতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা আমাদের নেই।এছাড়াও তার কাছে দেখতে চাওয়া হয়, ২৫ ডিসেম্বরের নির্বাচনে কারা কারা ভোট প্রদান করেছেন সেই তালিকাটা, তিনি কথা এড়িয়ে গিয়ে বলেন, সেই তালিকা আমার কাছে নেই-জেলা সমবায় অথবা অগ্রণী শেষ প্রকল্পের অফিসে যোগাযোগ করুন তবে তারা সাংবাদিকদের সেই তালিকা দিতে বাধ্য নয় বলে জানান।
জেলা সমবায় অফিসার আকরাম হোসেনের কাছে এসব অনিয়ম ও নির্বাচনে জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একাধিক লিখিত অভিযোগের প্রেক্ষিতে শুনানি কার্যক্রম শুরু করেছি। শুনানি শেষে এ বিষয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
জানা গেছে, অগ্রণী সেচ প্রকল্পের মোট ভোটার অডিট অনুসারে ২১৩৭। যদিও তফসিল অনুসারে তা ২১০৩ জন। এই প্রকল্পের সদস্যদের সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ছয় কোটি টাকা। সমবায় আইন (সংশোধিত) ২০১৩ বিধিমালা অনুযায়ী এফডিআরের নিয়ম না থাকলেও নির্বাচনের আগে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকে ১১ লাখ ৭৫ হাজার টাকার এফডিআর দেখিয়েছেন গত কমিটি, এমন আপত্তির অভিযোগও করেন নিরীক্ষা কমিটি।
Leave a Reply