প্রকল্প দুর্নীতির অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জেরে কেন্দুয়ায় সাংবাদিক হামলার শিকার
মোঃ রাসেল ফকির :
প্রকল্প দুর্নীতির অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের জেরে কেন্দুয়ায় সাংবাদিক মহিউদ্দিন তালুকদার হামলার শিকার হয়েছেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি
হামলার নেপথ্যে ইউএনও’র মদদের অভিযোগ।
আওয়ামী সরকারের আমলে সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে সংবাদ প্রকাশের জেরে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার সাহসী সাংবাদিক মহিউদ্দিন তালুকদার। দুর্বৃত্তদের পরিকল্পিত এলোপাতারি হামলায় গুরুতর আহত হয়ে তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন।
স্থানীয় জনগণ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা অভিযোগ তুলেছেন, হামলার নেপথ্যে শুধু প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ মহলই নয়, বরং কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমদাদুল হক-এর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদদ থাকতে পারে। এ ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
প্রকল্প দুর্নীতির অনুসন্ধান ও ক্ষোভের সূত্রপাত :
জানা গেছে, আওয়ামী সরকারের বরাদ্দকৃত গড়াডোবা ইউনিয়নের “ওয়াই কাঞ্চন মিয়া বাড়ি থেকে কান্দাবাড়ী পর্যন্ত রাস্তা সংস্কার প্রকল্প” নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেন সাংবাদিক মহিউদ্দিন তালুকদার। প্রতিবেদনে প্রকল্পের কোটি টাকার বরাদ্দের ব্যাপক অনিয়ম, আত্মসাত ও দুর্নীতির বিস্তারিত তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই স্থানীয় আওয়ামী প্রভাবশালী নেতা ফারুক মিয়া ও তাঁর সহযোগী চক্র সাংবাদিক মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। তাঁরা সংবাদ প্রকাশ ঠেকাতে এবং দুর্নীতির প্রমাণ গোপন রাখতে নানা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
শুনানি শেষে হামলার ঘটনা :
গত ১১ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) সুখময় সরকার উভয় পক্ষকে তাঁর কার্যালয়ে ডেকে শুনানি গ্রহণ করেন। শুনানি শেষে সরেজমিন তদন্তের জন্য তিনি সাংবাদিক মহিউদ্দিনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে প্রকল্প এলাকায় রওনা হন।
ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্রই প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক মিয়ার অনুসারীরা একযোগে মহিউদ্দিনের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, এ সময় নব্য বিএনপি নেতা হালিম মাস্টার ও তাঁর সহযোগীরাও হামলায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। দুর্বৃত্তরা লাঠি-সোটা ও লাথি-ঘুষি দিয়ে মহিউদ্দিনকে এলোপাতারি পেটাতে থাকে। এতে তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন।
ইউএনওর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন:
হামলার পরপরই এডিএম সুখময় সরকারের নির্দেশে ইউএনও ইমদাদুল হক আহত সাংবাদিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। তবে এর কিছুক্ষণ পর স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে দেওয়া ইউএনওর সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, “আমি একশ মিটার দূর থেকে দৌড়ে এসে দেখি, মহিউদ্দিনের সঙ্গে হালিম মাস্টার ও উত্তেজিত জনতা হাতাহাতিতে লিপ্ত হয়েছে। পরে আমি পরিস্থিতি শান্ত করি।”
কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীরা ইউএনওর এ বক্তব্যকে সম্পূর্ণ মিথ্যা আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, ঘটনাস্থলে কোনো ধরনের হাতাহাতি হয়নি, বরং মহিউদ্দিনকে একতরফাভাবে নির্মমভাবে প্রহার করা হয়েছে। এমনকি হামলার সময় ইউএনও ও এডিএম খুব কাছেই উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা আরও জানান, হালিম মাস্টার নিজে সাংবাদিককে লাথি মারার চেষ্টা করতে গিয়ে পড়ে যান, অথচ ইউএনও সেটিকে “মারামারি” বলে প্রচার করার চেষ্টা করেছেন।
ফলে স্থানীয়দের মধ্যে প্রবল সন্দেহ তৈরি হয়েছে—ইউএনওর সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে হামলার ঘটনাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।
পূর্ব অভিজ্ঞতা ও স্থানীয়দের ক্ষোভ:
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, এর আগেও সাংবাদিক মহিউদ্দিন তালুকদারের নামে মিথ্যা মামলা দেওয়ার নেপথ্যে ইউএনও ইমদাদুল হক সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন। তাই এই ঘটনার পরপরই তাঁর দেওয়া সাক্ষাৎকার ও অবস্থানকে অনেকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করছেন।
এ ঘটনায় এলাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক মহলেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দাবি—এ হামলার নেপথ্যে যেই থাকুক না কেন, প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করে দোষীদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
আহত সাংবাদিকের অবস্থা:
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মহিউদ্দিন তালুকদারের মাথা, বুক ও শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর আঘাত লেগেছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর মাথায় গভীর ক্ষত থাকায় অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
সাংবাদিক সমাজের প্রতিক্রিয়া:
এ ঘটনার পর স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের সাংবাদিক সমাজ তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। তাঁরা বলেন,
“দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা যদি সাংবাদিকদের জীবনের জন্য ঝুঁকি ডেকে আনে, তবে দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম ও মুক্ত মতপ্রকাশ চরম হুমকির মুখে পড়বে।”
সাংবাদিক নেতারা অবিলম্বে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও নেপথ্যের হোতাদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। একইসাথে তাঁরা সাংবাদিক মহিউদ্দিন তালুকদারের নিরাপত্তা ও যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
সার্বিক পরিস্থিতি:
একজন সাংবাদিকের ওপর দিনের আলোয় প্রকাশ্যে এ ধরনের সন্ত্রাসী হামলা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্যও গুরুতর হুমকি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
স্থানীয়রা বলছেন, প্রকল্প দুর্নীতি ঢাকতেই পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। এখন প্রশাসন চাইলে খুব সহজেই হামলাকারীদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারে। কিন্তু প্রশাসনের একটি অংশ যদি এই হামলার নেপথ্যে জড়িত থাকে, তবে ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
Leave a Reply